তৈরি হচ্ছে সুপারফাস্ট কোয়ান্টাম ইন্টারনেট, দৃটো মৃত নক্ষত্রের সংঘর্ষের শব্দ

মৃত নক্ষত্রের সংঘর্ষের শব্দ: দুটো নিউট্রন তারকার সংঘর্ষের ফলে যে শব্দটি তৈরি হয়েছিলো বিজ্ঞানীরা এই প্রথম সেটি রেকর্ড করেছেন।

নিউট্রন তারকা হলো মৃত নক্ষত্র। এগুলো একটি আরেকটির চারপাশে ঘুরছিলো। মরে যাওয়ার পর একটি অপরটির কাছে আসতে আসতে এক সময় একটি আরেকটির উপর আছড়ে পড়েছে। তারপর বিশাল এই বিস্ফোরণের শক্তি ছড়িয়ে পড়ে এই মহাজগতে। এই সংঘর্ষটি ঘটেছিলো আজ থেকে ১৩ কোটি বছর আগে যখন আমাদের এই পৃথিবীতে ডায়নোসর বিচরণ করতো। তবে এই সংঘর্ষের কারণে মহাকাশে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিলো সেটি আমাদের কাছে সবেমাত্র এসে পৌঁছেছে।

কম্পিউটারে তৈরি সংঘর্ষের ছবি

একে বলা হয়, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের কোন শব্দ নেই। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সিকে রূপান্তর ঘটিয়ে শব্দে পরিণত করতে পারেন যা আমরা শুনতে পারি। বড় ধরনের এই বিস্ফোরণে পৃথিবীতে দুর্লভ ও মূল্যবান কিছু ধাতব পদার্থের সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ ও প্লাটিনাম। বহু কোটি বছর আগে নিউট্রন স্টারের এই সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিজ্ঞানীরা ধরতে সক্ষম হয়েছেন গত সপ্তাহে। ব্রিটেনের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছেন, এই আবিষ্কার একটি দারুণ ঘটনা।

“বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দেখার জন্যে এ এক নতুন জানালা। মহাজগতে এরকম অনেক বিষয় আছে যা সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায় নি। এসব আমাদের বিস্মিত করে। এখনও আমরা আমাদের চোখ কান কচলাচ্ছি, কারণ মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শব্দে আমরা সবেমাত্র জেগে উঠলাম,” বলেন তিনি।

এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গটিকে শনাক্ত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় সৃষ্ট দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গে, লেজার রশ্মির সাহায্যে। এই সুড়ঙ্গটির নাম লাইগো। প্রায় আড়াই মাইল লম্বা। এবং এটি পৃথিবীতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কোন সরল রেখা। এরকম একটি সুড়ঙ্গে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কিভাবে শনাক্ত করা হলো?

লাইগো ডিটেক্টরের একজন বিজ্ঞানী প্রফেসর নোনা রবার্টস বলছেন, “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আড়াই মাইল দীর্ঘ এই টানেলে বসানো আয়নাকে খুব সামান্যই সরাতে পেরেছে। যতোটুকু সরিয়েছে তার পরিমাণ একটি পরমাণুর চাইতেও বহু গুণে কম। সেখান থেকেই এই তরঙ্গটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নোনা ও তার সহকর্মীরা মিলে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে শনাক্ত করেছেন। তারা বলছেন, এসব নক্ষত্র আকারে খুবই বড় ছিলো। আমাদের সূর্যের সমান।

লাইগো ডিটেক্টর

লাইগো প্রকল্পে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন পদার্থ বিজ্ঞানী প্রফেসর গ্যাব্রিয়েলা গঞ্জালেস। তিনি বলছেন, “ঠিক এই জিনিসটার জন্যেই আমরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আমরা জানি না আসলেই আমরা ভাগ্যবান কিনা, কারণ এরকম একটি ঘটনা ঘটে গেছে এবং সেটি ঘটেছে তুলনামূলকভাবে আমাদের এই পৃথিবীর খুব কাছেই।”

“তবে এটি একটি বিরল ঘটনা। অথবা এমনও হতে পারে এই মহাজগতে যতো নিউট্রন স্টার আছে বলে আমরা ধারণা করেছিলাম, এসব নক্ষত্রের সংখ্যা হয়তো তার চাইতেও অনেক বেশি। সেসব আমরা এখনও জানি না। তবে অবশ্যই আমরা জানতে পারবো।”

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারী এই যন্ত্রটিকে আরো আধুনিক করার কাজ চলছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই যন্ত্রের সাহায্যে তারা হয়তো অতীতে ঘটে যাওয়া এরকম আরো বহু বিপর্যয়কর মহাজাগতিক ঘটনার ইতিহাসের সন্ধান পাবেন। তারা বলছেন, মহাকাশে হয়তো তারা এরকম আরো কিছু বস্তু আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন, যেসব সম্পর্কে আমরা এখনও কল্পনাও করতে পারিনি।

সুপারফাস্ট কোয়ান্টাম ইন্টারনেট: একটি সুপারফাস্ট কম্পিউটারের কথা কল্পনা করুন যা আজকের কম্পিউটারের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত গতিতে সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই যন্ত্রটির নাম কোয়ান্টাম কম্পিউটার। বিশ্বের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে এই কম্পিউটারটি তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে আলোর উপর ভিত্তি করে অত্যন্ত দ্রুত গতির কোয়ান্টাম ইন্টারনেট তৈরি করার কথা ভাবছেন।

ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে ইন্টারনেট

কিন্তু এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন হবে খুবই কঠিন এক কাজ। কারণ এর জন্যে যে যন্ত্র প্রয়োজন সেটিই এখনও তৈরি হয়নি। তবে বিজ্ঞানীদের জন্যে কোয়ান্টাম যোগাযোগ খুব আকর্ষণীয় একটি বিষয়। কারণ এই প্রযুক্তিতে আমরা আরো দ্রুত এবং নিরাপদ উপায়ে তথ্য পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারবো।

এই কোয়ান্টাম ইন্টারনেট তৈরির ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন একটি বিষয়ে বিতর্ক চলছে। সেটা হলো এটি কি আলোর কণা অর্থাৎ ফোটন নাকি ম্যাটার বা বস্তুর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে।

বিবিসি

Comments

comments