নেশায় আসক্ত দেশের ৫৩% তরুণ : সবচেয়ে বেশি আসক্তি ইয়াবায়

কক্সবাজারের একটি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র (রিহ্যাব)। এখানকার খালি ঘরগুলো আকারে অনেকটা কারাপ্রকোষ্ঠের মতো। ঘরের খাটগুলোর নিচে আবার গোলাপি বেডপ্যান। আসলে বাংলাদেশের মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোয় আরামে বসবাসের চিন্তা একরকম অবাস্তব।

রিহ্যাবটির গ্লাসবিহীন জানালাগুলো প্রায়ই বন্ধ থাকে। মাঝের হলওয়ে গিয়ে থেমেছে বড় এক কক্ষে, যেখানে ডজনখানেক মাদকাসক্তকে গ্রুপ থেরাপি দেয়া হয় নিয়মিত। সেখানে প্রতিদিনই তাদের নিজেদের ভেতরের ক্লেদগুলোর মুখোমুখি হতে হয়।
এখানে চিকিত্সা গ্রহণকারীদের একজন কাশেম। তার সঙ্গে যখন কথা হয়, সে তখন এ রকমই একটি থেরাপি সেশন শেষ করে ওপর তলার অফিসে আসে সাক্ষাত্কার দিতে। কথা বলার জন্য অফিস রুমে গাদাখানেক ‘সেরা এনজিওর’ পুরস্কার আর তহবিলদাতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে রিহ্যাব পরিচালকের ছবির সামনে এসে বসল কাশেম। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রটিতে রয়েছে কাশেম। এখানে মেথামফেটেমিন বা ইয়াবা আসক্তির চিকিত্সা নিচ্ছে সে। থাই শব্দ ইয়াবার অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘পাগলা বড়ি’।

আমরা যেখানে বসেছিলাম, সেখান থেকে নাফ নদীর দূরত্ব প্রায় ৫০ মাইল। মিয়ানমার বা সাবেক বার্মা এবং বাংলাদেশের সীমান্তরেখা হয়ে বয়ে যাচ্ছে নদীটি। এটি যখন লেখা হচ্ছে, তখন সীমান্ত এলাকাটি বেশ ব্যস্ত। জাতিগত নিধন থেকে রেহাই পেতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে। অন্য সময়ও এ এলাকাটি সরগরম থাকে, তবে মেথ বা ইয়াবা পাচারের ব্যস্ত এক রুট হিসেবে।

কাশেমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ঢোকে শুঁটকি আমদানির আড়ালে অথবা যানবাহনের ভেতরে লুকিয়ে। স্থানীয় ট্যাক্সিচালকরাই এসব ইয়াবা বণ্টন করে থাকে। শুধু ফোন দিলেই হবে। তারা নিজেরাই এসে আপনার চাহিদা অনুযায়ী ইয়াবা দিয়ে যাবে। অনেকেই এখন অন্য নেশা ছেড়ে ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমি নিজেও আগে হেরোইনে আসক্ত ছিলাম। কিন্তু হেরোইন গ্রহণের পর আমি দুর্বল হয়ে পড়তাম। আর এখন ইয়াবা নেয়ার পর রক্ত টগবগ করে ওঠে। মনে হয় কোনো কিছুকেই গ্রাহ্য করার প্রয়োজন নেই। নিজেকে অনেক শক্তিশালী মনে হয়।’

সাংবাদিক উইলিয়াম ল্যাঙ্গেভিশ ২০০০ সালের দিকে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশীরা আসলে জাতিগতভাবে মর্মপীড়ায় ভোগার মতো জাতি নয়।’ সে সময় দেশটির জনগণের দৈনিক মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ ছিল ২ ডলারেরও নিচে। এর পর থেকে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমানোয় কিছুটা সাফল্য এসেছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে একেবারে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে দেশটি। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশটির বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে প্রতি বছরই। দেশটির পরিবেশের মতোই দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে মাদক পরিস্থিতিও।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ইয়াবার ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এটি আটকের পরিমাণও বেড়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে সীমান্তরক্ষী— বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে ধরা পড়েছিল ৮১ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট। ২০১৬ সালে এসে বিজিবির আটক করা ইয়াবার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে ওই বছরের জানুয়ারিতে শুধু একদিনের অভিযানেই ধরা পড়েছিল ২৮ লাখ ইয়াবা।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়াবা পিল আসলে মেথামফেটামিনের সস্তা ও ভেজাল সংস্করণ। প্রতিটি ট্যাবলেটের ওজন ৯০ মিলিগ্রাম। এর মধ্যে বিশুদ্ধ মেথামফেটামিনের পরিমাণ ৫ থেকে ২০ শতাংশ। বাকি অংশ মূলত ক্যাফেইন দিয়ে তৈরি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ ইয়াবা ট্যাবলেটই মিয়ানমারে উত্পাদন হয়। একসময় দেশটিতে আফিমের উত্পাদন হতো ব্যাপক আকারে। ১৯৯০ সালের দিকে এসে সে দেশের মাদক চক্রগুলো আরো সস্তা ও জঘন্য অ্যামফিটামিন জাতীয় উদ্দীপক নেশাদ্রব্য প্রস্তুত শুরু করে। সে সময় মাদক চোরাচালানের জন্য চীন ও থাইল্যান্ডের সনাতন রুটগুলো ব্যবহার করত বর্মি চোরাকারবারিরা।
ইউএনওডিসির প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে চীন ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পরিপ্রেক্ষিতে রুট বদলাতে বাধ্য হয় বর্মি চোরাচালানিরা। পরবর্তীতে লাওসের মধ্য দিয়ে বর্মি মাদক চোরাচালানের মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার স্রোত প্রমাণ করছে, এটিও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চোরাচালানির রুট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কার্যক্রম পরিচালনায় তহবিল হ্রাসের আশঙ্কা সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত ইয়াবা সমস্যা নিয়ে যেসব সংস্থা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম ইউএনওডিসি। সংস্থাটির আঞ্চলিক প্রতিনিধি জেরেমি ডগলাসের ভাষ্য অনুযায়ী, জনাকীর্ণ, দরিদ্র ও জটিল এ অঞ্চলে মাদক ব্যবসা সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য বের করে আনা কঠিন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা দেশটিকে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের জন্য বাজার গড়ে তোলার মতো যথেষ্ট আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী মিয়ানমারের রাখাইনে বেশকিছু বড় ধরনের চালান জব্দ হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা অপর্যাপ্ত ও অনেকাংশেই অসত্য।’

সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত দশকে দেশের তরুণদের মধ্যেই মাদকাসক্তি ছিল বেশি। এ সময় ধনী পরিবারের পশ্চিমা সাজপোশাকে সজ্জিত মেয়েদের মধ্যেও মাদকাসক্তি দেখা দিতে শুরু করে। বিভিন্ন ক্লাবে এখন প্রায়ই বিভিন্ন আমোদ-প্রমোদে পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। এসব পার্টিতে ইয়াবা, কেটামিন ছাড়াও বিভিন্ন যৌন উত্তেজক মাদক ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ইয়াবা প্রথম প্রবেশ করে ২০০০ সালের শুরুর দিকে। সে সময় ধনীর দুলালদের মধ্যেই এর ব্যবহার ছিল বেশি। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের হাতে ব্যয়যোগ্য অর্থ ও শহুরে পার্টিগুলোয় প্রবেশাধিকার— দুটোই বেড়েছে। ফলে সারা রাত উন্মত্ততায় মাতিয়ে রাখার মতো মাদকের চাহিদাও এদের কাছে বেড়েছে। এতে আরো বলা হয়, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পথশিশুদেরও এখন ইয়াবা সেবন করতে দেখা যায় এবং এর মাত্রা বাড়ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বন্ধু বা বয়ফ্রেন্ডের পাল্লায় পড়ে স্কুল ও কলেজগামী মেয়েরাও এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।’

ইয়াবার হঠাৎ উত্থানে বেশ হতবাক তুলনামূলক বয়স্ক প্রজন্মের অনেকেই। ঢাকাভিত্তিক সোস্যাল সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলের রিসার্চ ফেলো হোসেইন মুহাম্মদ জাকি পুলিশ স্টাফ কলেজের অক্টোবর’২০১৫ সংস্করণে লিখেছিলেন, ‘কিছু একটা জ্বলছে। এবং তা শুধু অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ইয়াবা নয়। জ্বলছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সেরা সময়টা। জ্বলছে আমাদের তারুণ্যের প্রতিশ্রুতি।’

হোসেইন মুহাম্মদ জাকির তথ্য অনুযায়ী, দেশের তরুণদের ৫৩ দশমিক ২৭ শতাংশ এখন মাদকাসক্ত। ৩৭ বছর বয়সী কাশেমও তরুণ অবস্থা থেকেই স্থানীয় মাদক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন দেখে এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমার বয়স যখন কম ছিল, তখন দেখেছি, তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তের হার ছিল বড়জোর ১০ শতাংশ। এখন দেশের তরুণদের মধ্যে অর্ধেকই ইয়াবায় আসক্ত। হাতে টাকা-পয়সা আসতে শুরু করার কারণেই হয়তো এখন এ অবস্থা দেখা দিয়েছে। আমার বড় ছেলে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। আমি তাকে সৌদি আরবে কাজ করতে পাঠিয়ে দেব। কারণ আমার আশঙ্কা, ইয়াবা অন্যসব তরুণের মতো তাকেও ধ্বংস করে দেবে।’

তথ্যমতে, বাংলাদেশী মাদকাসক্তদের দৈনিক মোট ইয়াবা সেবনের পরিমাণ ২০ লাখ ট্যাবলেট। এতে আসক্তদের চিকিত্সায় বেশ কৌশল অবলম্বন করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ইয়াবাসক্তি নিরাময়ের মতো সরকারি কেন্দ্র রয়েছে মাত্র পাঁচটি। অন্যদিকে বেসরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৬৮টি।

(লেখক: সভাপতি, ওভারসিজ প্রেস ক্লাব অব কম্বোডিয়া। দ্য ফিক্সে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাষান্তর)

বণিকবার্তা

Comments

comments