কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা, কেন্দ্রের শাসন জারি স্পেনের

স্পেন থেকে পুরোপুরি পৃথক হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে কাতালোনিয়া। স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিতে স্পেন সরকারের উদ্যোগের মধ্যেই এই ঘোষণা আসল।

এদিকে, কাতালুনিয়ার পার্লামেন্ট স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর এতদিনের স্বায়ত্তশাসিত ওই অঞ্চলে কেন্দ্রের শাসন জারি করেছে স্পেন সরকার। গত কয়েক মাস ধরে টানাপড়েনের পর শুক্রবার কাতালুনিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্টে স্বাধীনতার প্রশ্নে ভোটাভুটি হয়। ভোটাভুটিতে স্বাধীনতার পক্ষে ৭০ জন আর বিপক্ষে ১০ জন আইনপ্রণেতা ভোট দেন। দুটি ব্যালট ফাঁকা ছিল। বিরোধী দল এই ভোট বর্জন করে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয় স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘোষণা দিয়ে কাতালোনিয়ায় প্রত্যক্ষ শাসন জারির কথা জানালে কিছুক্ষণের মধ্যেই কাতালান পার্লামেন্ট স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে রায় দেয়। এর আগে কেন্দ্রের বাধা উপেক্ষা করে ১ অক্টোবর গণভোটের আয়োজন করা হয় কাতালোনিয়ায়। এতে ৯০ শতাংশ ভোটার কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন। এরপর পার্লামেন্টে স্বাধীনতার ঘোষণায় সই করলেও ৮ সেকেন্ড পর তা স্থগিত রেখে আলোচনার প্রস্তাব দেন কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজেমন।

তবে স্পেন শুরু থেকেই সরকার এই গণভোটকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক হিসেবে অভিহিত করে এসেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সরকারের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। গত কয়েক মাস ধরে টানাপড়েনের পর শুক্রবার কাতালুনিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্টে স্বাধীনতার প্রশ্নে ভোটাভুটি হয়। সেখানে স্পেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পাস হলে পার্লামেন্টের বাইরে উপস্থিত হাজারো জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে।

কাতালোনিয়ার পরিচয়
কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই কাতালোনিয়ায়। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। তাদের আছে নিজস্ব ভাষাও। বার্সেলোনা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি, ফুটবল এবং একই সাথে পর্যটনের কারণে।

স্পেন সরকার বলছে, এই গণভোট অবৈধ। শুধু তাই নয়, আদালত থেকেও এই ভোটের আয়োজন বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই কাতালোনিয়ার সরকার স্কুলগুলোতে ভোটকেন্দ্র বসানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাতে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। অভিযান চালিয়ে অনেক ভোট কেন্দ্রই পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, কাতালোনিয়ার সরকারের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ব্যালট পেপার, স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। কিন্তু ভোটের পক্ষে রাস্তায় নেমে এসেছেন কাতালানরা। কেন্দ্রীয় সরকারের বাধার প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, স্পেনের ক্ষুদ্র একটি অংশ হয়েও তারা কেন স্বাধীনতা চাইছে? আর এর সম্ভাবনাই-বা কতোটা?

কিভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো?
কাতালোনিয়া স্পেনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এর লিখিত ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলের ছিলো বড়ো রকমের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে নানা ভাবে খর্ব করা হয়। কিন্তু ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। এবং তীব্র আন্দোলন ও দাবির মুখে ওই অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর সেটা করা হয় ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায়।

স্পেনের সংসদে ২০০৬ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যেখানে কাতালোনিয়াকে আরো কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়। কাতালেনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে কাতালোনিয়াকে দেওয়া এরকম অনেক ক্ষমতা পরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত বাতিল করে দেয় যা কাতালোনিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। স্বায়ত্তশাসন কাটছাঁট করার ফলে ক্ষুব্ধ কাতালানরা, এর সাথে যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি খরচ কমানো, ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিক-ভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে।

আরটিএনএন

Comments

comments