দোহারের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প

ঠেকসই বুনন ও বৈচিত্র্যের জন্য দোহারের তাঁতিদের হাতে বুনানো লুঙ্গির কদর রয়েছে দেশজুড়ে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এখানকার তাঁতিরা। একসময় বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় তৈরি হতো এই দোহারেই। সময়ের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে অনেক আগেই হারিয়ে গেছে মসলিন কাপড়। স্থানীয় তাঁতিদের তাঁতের সাহায্যে বুনানো লুঙ্গি উৎপাদন ও বিক্রি করে একসময় আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন এখানকার তাঁতিরা। কিন্তু সরকারের কোনো সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ না থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে শিল্পটি।

জানা যায়, প্রায় তিন শ’ বছর আগে তাঁত শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন শাড়িসহ, গামছা ও লুঙ্গি তৈরি হতো তাঁতের সাহায্যে। ১৯৩৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহাত্মা গান্ধী দোহারের মালিকান্দায় আসেন এবং নিখুঁত বুননের সাহায্যে যারা মুসলিন কাপড় তৈরি করতেন এমন কয়েকজন লুঙ্গি তৈরির কারিগরকে নিজ হাতে পুরস্কৃত করেছিলেন। সেই সময় এ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন খেয়েপরে ভালোভাবে জীবনযাপন করতেন। বারো মাসে তেরো পার্বনের মধ্য দিয়ে কাটত তাঁতিদের নিত্যদিন। বর্র্তমানে এ শিল্প কোনো রকম টিকে থাকলেও ভালো যাচ্ছে না তাদের দিনকাল। তাদের অভিযোগ, লুঙ্গির দাম না বাড়লেও লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে সুতার দাম। বর্তমানে মারাত্মক শ্রমিকের সঙ্কট চলছে। শ্রমিকের জন্য অনেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

তাঁত শিল্পের আজ আর সুদিন না থাকলেও বাপ-দাদার এ পেশাকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় তাঁতিরা। দোহার উপজেলার সব ক’টি ইউনিয়নে তাঁতের কাজ হয় কম বেশি; তবে জয়পাড়া ও রাইপাড়া ইউনিয়ন তাঁতপল্লী হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে অনেক আগেই থেকেই। নিকট অতীতে দোহার উপজেলার মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ লোক এ পেশার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে জীবনজীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু বহুমাত্রিক সমস্যার কারণে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। কোনোরকম টিকে থাকলে শিল্পটিকে টেকসই উন্নয়নের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ অনেকেরই।

একসময় দোহারে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার তাঁত চালু ছিল তা কমে দাঁড়িযেছে ২ হাজারে। বিরাট একটি জনগোষ্ঠী মানুষের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন সেটা হয়নি, আর এ অবস্থার জন্য তাঁতিরা দুষছেন সরকার ও এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকনেতাদের। এ ব্যাপারে কথা হয় স্থানীয় তাঁতিদের সাথে। তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রতি বছর লুঙ্গি তৈরির ব্যবহৃত সুতা ও রঙের দাম লাগামহীন বেড়েই চলেছে। নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা তাঁতি সম্প্রদায়কে ভোট ব্যাংক মনে করে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর আর কোনো খোঁজখবর রাখেন না তারা। চর জয়পাড়া এলাকার মো: রফিক নামে একজন প্রান্তিক তাঁতি বলেন, বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মেশিনে তৈরি লুঙ্গি কিনে তাতে স্টিকার লাগিয়ে দোহারের লুঙ্গি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। এতে এক দিকে যেমন ক্রেতারা ঠকছেন অন্য দিকে সুনাম হারাচ্ছে দোহারের লুঙ্গির।

দেওয়ান বাছের বলেন, কয়েক বছর আগেও সপ্তাহে দুই দিন তাঁতিদের উৎপাদিত লুঙ্গির জমজমাট হাট বসত জয়পাড়া ও শিবরামপুরে। এখন আর হাটগুলোতে আগের মতো ক্রেতা সমাগম হয় না। তবে তাঁতিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, তাঁতিদের চরম দুর্দিন যাচ্ছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থাসহ সুতা ও ব্যবহৃত উপকরণের দাম কমাতে হবে। লক্ষ্মীপ্রাসাদ এলাকার শতবর্ষী তাঁতি বারেক দেওয়ান অভিযোগ করে বলেন, আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে দোহারের তাঁতি মসলিম কাপড় বুনাতেন সেই সাথে অন্যান্য শাড়ি তৈরি করত এখানকার তাঁতি সমবপ্রদায়ের লোকজন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে তাঁতি সম্প্রদায়ের লোকজন এ পেশা ছেড়ে দিয়ে বিদেশমুখী হওয়ায় অনেক পরিবার এ কাজ করেন না। এখন কোনো রকম লুঙ্গি তৈরির কাজ টিকে থাকলেও এ শিল্পকে রক্ষার জন্য কেউ এগিয়ে আসছেন না। এ দিকে তাঁতিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ১৯৪৭ সালে দোহার নবাবগঞ্জ ইউভার্স কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি সমবায় সমিতি গঠন করা হয়।

তাঁতিদের শ্রম আর ঘামের উপার্জিত অর্থ দিয়ে কোটি কোটি টাকা সম্পদ করা হলেও তাঁতিদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কিছুই করছে না বলে অভিযোগ তাঁতিদের। এ ব্যাপারে দোহার নবাবগঞ্জ ইউভার্স সমবায় সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বিগত দিনগুলোতে যারা এই সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কিছুই করেননি। আমরা সবার সাথে আলাপ আলোচনা করে আগামীতে তাঁত শিল্পের উন্নয়নের কিছু একটা করার উদ্যোগ নেবো।

তবে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে অধুনালুপ্ত এ শিল্পটি হারিয়ে যাবে বিলুপ্ত অনেক শিল্পের মতোই।

সূত্র: নয়া দিগন্ত

Comments

comments