অঝরে কাঁদছে হোমনা তিতাস মেঘনার নারী-পুরুষ ও শিশুরা

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারের জন্য কাঁদছে কুমিল্লার হোমনা, তিতাস ও মেঘনাবাসী। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুপুরে লাশ নিয়ে কুমিল্লায় পৌঁছলে সেখানে জনতার ঢল নামে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে হাত রেখে অনেকেই কাঁদতে থাকেন, এসময় এলাকাবাসীর কান্নার রোল পড়ে যায়, অঝরে কাঁদতে থাকে নারী-পুরুষ ও শিশুরা। এতে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যে অবতারণা হয়।

পরে বাদ আসর জানাজা নামাজ শেষে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার হোমনা গ্রামের পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হবে।

এর আগে সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর কাঁটাবন মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ১২টার দিকে নয়াপল্টনের বিএনপির প্রধান কার্যালয়ের সামনে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার লাশ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নেয়া হয়। সেখানে তৃতীয় জানাযা শেষে হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে বুধবার কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি ছিলেন কুমিল্লার হোমনা, তিতাস ও মেঘনা উপজেলাবাসীর একজন অভিভাবক। কর্মজীবন থেকেই তিনি এলাকার উন্নয়ন করেছেন। বিশেষ করে হোমনার চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য দল মত নির্বিশেষে সকলের কাছেই তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তার সততা, নিষ্ঠা এবং ভালোবাসায় ছিল মানুষ মুগ্ধ।

এ অঞ্চলে দীর্ঘ ২৫ বছরে রাজনীতিতে বড় ধরণের কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। ১৯৯০ সালের আগে হোমনা-মেঘনা উপজেলা ছিল এক দুর্গম জনপদের নাম। দূর-দূরান্ত থেকে আসা যে কোনো চাকুরিজীবী থেকে সাধারণ মানুষের জন্য এ জনপদ ছিল এক শাস্তির দ্বীপ। এম কে আনোয়ারের নিরলস প্রচেষ্টায় পাল্টে যায় এ জনপদের চেহারা।

যেখানে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস ছিল মানুষের কাছে রূপকথা। সেই রূপকথাকেই বাস্তবে পরিণত করে তিনি হয়েছেন এক কিংবদন্তি। রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন খাতে আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের আপনজন হয়ে উঠেন।

এম কে আনোয়ারের মৃত্যুর খবরটি রাতের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়লে এলাকার সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। সকাল থেকেই দলে দলে লোকজন তার হোমনাস্থ বাসভবনে ছুটে যান। আবেগ সামলাতে না পেরে অনেকেই তার ছবি সংবলিত পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে কাঁদতে থাকেন।

সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষ। তার জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। পুরো নাম মোহাম্মদ খোরশেদ আনোয়ার, সংক্ষেপে তিনি এম কে আনোয়ার। তিনি ১৯৩৩ সালে ১ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ওপারচর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবিদ আলী ছিলেন একজন শিক্ষক। এম কে আনোয়ার পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিভিন্ন সূত্রে জনা গেছে, শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৪৮ সালে লেটারমার্কসহ ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে আইএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিভাগে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এম কে আনোয়ার ১৯৫৬-১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছরের কর্মময় জীবনে তিনি ফরিদপুর ও ঢাকার ডেপুটি কমিশনার, জুটমিলস কর্পোরেশন, টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বিমানের চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন। এম কে আনোয়ার ১৯৭১ সালে ঢাকার জেলা প্রশাসক ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব, অর্থসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা কেবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার পেশাগত জীবনের এক সময় পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফারুক লেঘারীর অধীনেও চাকুরি করেছেন।

রাজনৈতিক জীবনে এম কে আনোয়ার যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র- তখন ছাত্র সংসদের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফজলুল হক হলের ছাত্র থাকাবস্থায় এম কে আনোয়ার ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৯১ সাল থেকে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সফলতার সাথে নৌ পরিবহন, বাণিজ্য, শিল্প, দপ্তরবিহীন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সর্বশেষ ২০০১ সালে কৃষি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি দলের একজন অন্যতম সহ-সভাপতি হন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্যপদ লাভ করেন। ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে কয়েকবার কারাভোগ করেছেন।

ব্যক্তিজীবনে এম কে আনোয়ার স্ত্রী মাহমুদা আনোয়ার (শের-এ বাংলা এ কে ফজলুল হকের অনুসারী ও পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের মেয়ে), তার দুই ছেলে মাহমুদ আনোয়ার কাইজার এমবিএ- একজন সফল ব্যবসায়ী, ছোটো ছেলে মাসুদ আনোয়ার এমবিএ পাশ করে বর্তমানে আমেরিকার একটি মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেট কোম্পানিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে খাদিজা আনোয়ার একজন সাবেক বিসিএস ক্যাডার।

বুধবার তিতাস উপজেলার গাজীপুর স্কুল মাঠে বাদ জোহর এবং হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাদ আছর জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানের দাফন করা হয়।

সূত্র: আরটিএনএন

Comments

comments